সরকার পতনের পর গণপিটুনির ভয়াল উত্থান: পুলিশের ব্যর্থতা, বিচারের অনিশ্চয়তায় জনমনে আতঙ্ক
বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি গণপিটুনির ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। কখনও বিগত সরকারের কর্মী-সমর্থক সন্দেহে, কখনও ধর্ম অবমাননার অভিযোগে, আবার কখনও চুরির অভিযোগে এসব পিটুনির ঘটনা ঘটছে, যেখানে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
মানবাধিকার কর্মীরা অভিযোগ তুলছেন যে, পুলিশের দুর্বলতা এবং অপরাধ তদন্তে ঘাটতি থাকায় এসব গণপিটুনির ঘটনা থামানো সম্ভব হচ্ছে না। অপরদিকে, পুলিশ প্রতিটি ঘটনার যথাযথ তদন্ত করে বিচারের আওতায় আনার আশ্বাস দিলেও বিচার প্রক্রিয়ায় ধীরগতি ও অকার্যকারিতার কারণে অপরাধীরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
নতুন করে আলোচিত গণপিটুনির ঘটনা
সবশেষ বুধবার রাতে ঢাকার ফজলুল হক মুসলিম হলে চোর সন্দেহে তোফাজ্জল নামে একজনকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাকে আটক করে নির্যাতন চালায় এবং নির্যাতনের একপর্যায়ে ক্যান্টিনে বসিয়ে ভাত খাওয়ানোর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর কিছুক্ষণ পরই গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তোফাজ্জলকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে জানা যায়, তিনি একজন মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তি ছিলেন, যা ঘটনাটিকে আরও মর্মান্তিক করে তুলেছে।
এছাড়া, একই দিনে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শামীম আহমেদও গণপিটুনির শিকার হয়ে মারা যান। ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা তাকে ঘিরে ধরে মারধর করে এবং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
এর আগে ৭ই সেপ্টেম্বর রাতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আব্দুল্লাহ আল মাসুদ গণপিটুনির শিকার হয়ে নিহত হন। মর্মান্তিকভাবে, মাসুদের মৃত্যুর পাঁচ দিন আগেই তিনি কন্যা সন্তানের বাবা হয়েছিলেন। তার উপর এই নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
গণপিটুনির প্রবণতা ও আইনের ব্যর্থতা
২০১৯ সালের আলোচিত বাড্ডায় তাসলিমা বেগম রেণুর হত্যার পর থেকে গণপিটুনির ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য মতে, গত সাড়ে ছয় বছরে গণপিটুনিতে ২৮৬ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। এইসব হত্যাকাণ্ডে দায়ের করা মামলাগুলোর বেশিরভাগই বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, শাস্তি হয় খুবই কম।
মানবাধিকার কর্মীরা মনে করেন, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও বিচার ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে এই প্রবণতা থামছে না। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সরকারের পতনের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা কমে যাওয়ার ফলে সমাজে "মব জাস্টিস" বা গণপিটুনির সংস্কৃতি বেড়ে গেছে।
গুম হওয়া ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহে গঠিত তদন্ত কমিশনের সদস্য ও মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন, "গত ১৫/১৬ বছর মানুষ স্বৈরাচার ও তাদের দোসরদের দ্বারা নিপীড়িত হয়েছে। এতে জনমনে জমে থাকা ক্ষোভ এখন সহিংসতার মাধ্যমে বের হচ্ছে।"
তিনি আরও বলেন, "পুলিশকে কার্যকরভাবে কাজে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত এমন কর্মকাণ্ড থেকে কর্মীদের বিরত রাখার কঠোর বার্তা দেওয়া।"
গণপিটুনির বিরুদ্ধে আইন কী বলছে?
বাংলাদেশের সংবিধান এবং প্রচলিত আইনে প্রতিটি নাগরিকের আইনের আশ্রয় পাওয়ার অধিকার রয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৯ ধারা অনুযায়ী, অপরাধী সন্দেহে কাউকে আটক করা হলে তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু গণপিটুনির ঘটনায় এই নিয়ম মানা হয় না।
যদি গণপিটুনিতে কেউ আহত হন, তবে দণ্ডবিধির ৩২৩ ধারা অনুযায়ী এক বছরের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা অর্থদণ্ড হতে পারে। গুরুতর আঘাতের ক্ষেত্রে শাস্তি সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
আর যদি গণপিটুনিতে কেউ মারা যান, তাহলে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যাকারীদের মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আইন অনুযায়ী গণপিটুনিতে অংশগ্রহণকারী সবাই সমানভাবে দায়ী বলে গণ্য হয় এবং তাদের সবারই একই শাস্তি হয়।
ad4
আদালতের নির্দেশনা ও গণপিটুনি রোধে ব্যবস্থা
২০১৯ সালে বাড্ডায় রেণু হত্যার ঘটনায় আদালত গণপিটুনি রোধে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, প্রতিটি থানার ওসির সঙ্গে গণপিটুনির প্রবণতা নিয়ে ছয় মাসে অন্তত একবার বৈঠক করা, গণমাধ্যমে সচেতনতা প্রচার চালানো এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব বা উত্তেজনা সৃষ্টিকারী কনটেন্ট বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
কিন্তু বাস্তবে এই নির্দেশনাগুলো কতটুকু কার্যকর হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত না হলে গণপিটুনির এই ভয়াল পরিস্থিতি থামবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

0 Comments